পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনকে বৈধতা দেয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বয়ান। এ বয়ানকে বৈধতা দিয়ে বহুজাতিক ঋণদাতাগোষ্ঠীগুলোও বাংলাদেশের উন্নয়নকে ‘মিরাকল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যদিও কভিডের অভিঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাবে সেই ‘মিরাকলের’ অর্থনীতি কঠিন সংকটের মুখে পড়ে যায়। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে আওয়ামী শাসনামলের। দীর্ঘ সময়ের দুঃশাসনের ফলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক গবেষণার তথ্য বলছে, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সংহত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বাংলাদেশকে এ গবেষণার প্রধান উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে, এখানে গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও রাষ্ট্রের সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। বিদ্যমান ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা নেই।
সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইনস্টিটিউট (এডিবিআই) ‘এক্সিটস ফ্রম দ্য ফোর-লেন হাইওয়ে টু ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট: হোয়াটস আর দ্য রিস্কস টু সাসটেইনড ইকোনমিক গ্রোথ?’ শীর্ষক একটি ওয়ার্কিং পেপার প্রকাশ করেছে। এতে অর্থনীতিবিদ ল্যান্ট প্রিচেট এশিয়ার ১৩টি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে মাথাপিছু জিডিপির প্রবৃদ্ধি যতটা দৃশ্যমান, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ততটাই দুর্বল, স্থবির বা নেতিবাচক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কিনা। গবেষণায় উৎপাদনশীলতা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক সাম্যকে চার লেনের একটি উন্নয়নের মহাসড়কের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নের এ মহাসড়কের ক্ষেত্রে অনেক দেশের গতি কেবল এক লেনেই প্রবল, বাকি তিনটিতেই স্থবিরতা কিংবা পেছনের দিকে যাচ্ছে। এসব দেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা এবং আন্তঃদেশীয় তুলনামূলক মানদণ্ডের মধ্যে ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। মূল্যায়নে সরকারের কার্যকারিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মান—এ সূচকগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০০৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অথচ ওই সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ১-১০০ স্কেলে মাত্র এক পয়েন্ট বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরসের (ডব্লিউজিআই) রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা সূচক অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ৩৩ দশমিক ৬। এই অপ্রতিসম গতিকে প্রিচেট আখ্যায়িত করেছেন ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ হিসেবে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং তার আগের কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা গবেষণায় উল্লিখিত কাঠামোগত দুর্বলতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। গবেষক বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিরাজ করলে তা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং ফল হতে পারে সরকার পরিবর্তন, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও প্রবৃদ্ধির পতন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস’ অনুযায়ী কন্ট্রোল অব করাপশন, গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেস, রেগুলেশন, অ্যাকাউন্টেবিলিটিসহ ছয়টি ইন্ডিকেটর রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল। এটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার ভিত্তিতে নয়, বাংলাদেশের উন্নয়নের সমতুল্য পর্যায়ে আছে এমন দেশের তুলনায়ও দুর্বলতাটা বেশি। এটি একটি পুরনো ফ্যাক্ট, নতুন কিছু নেই। সূচকে যেটা মাপা হয় পাবলিক সেক্টরে দুর্নীতির কথা বলা হয়। গত প্রায় ১৫ বছর এ চিত্র একই আছে। কোনো উন্নতি নেই। তার আগে থেকেও দুর্নীতি বেশি ছিল। সব সরকারের অধীনেই দেখা গেছে এটা ছিল। এখন এত বড় একটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ওই জায়গায় কোনো আঁচড় পড়েছে বলে মনে হয় না।
তিনি আরো বলেন, ‘গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেসকে শুধু দুর্নীতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কারণ একই রকম দুর্নীতি নিয়েও অনেক দেশ আছে যাদের গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেস আমাদের চেয়ে ভালো। ভিয়েতনামের কথাই যদি বলি সেখানে দেখা যায় দুর্নীতির চিত্রে খুব বেশি তফাত নেই। কিন্তু গভর্নমেন্ট ইফেক্টিভনেসের জায়গায় তারা অনেক এগিয়ে।’
সার্ভিস ডেলিভারির ক্ষেত্রে প্রশাসনের কোয়ালিটি অনেক কিছু নির্ভর করে উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা সিভিল সার্ভিসের কোয়ালিটি ব্রিটিশদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। সেটি ব্রিটেনে বদলে গেছে কিন্তু আমাদের এখানে এখনো রয়ে গেছে।’
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ক্ষেত্রে বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অবস্থান কী হতে পারে সেটিও গবেষণায় উঠে এসেছে। দেখা যায়, বাংলাদেশ যদি ১৯৯০ থেকে ২০২২ সময়ের গড় প্রবৃদ্ধি (৪ দশমিক ১ শতাংশ) অব্যাহত রাখতে পারে, তবে ২০৫০ সালে মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ২৪ হাজার ডলারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রবৃদ্ধি বর্তমান হারে চললে এ সময়ে স্কোর হবে মাত্র ৩৭-৩৮। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২৪ হাজার ডলারের জিডিপি অর্জনকারী একটি দেশের জন্য এই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা হবে বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন, বেলারুশ ছাড়া আর কোনো দেশ এর কাছাকাছিও থাকবে না। এ ব্যবধানকে গবেষণায় বলা হয়েছে ‘স্টেট ক্যাপাবিলিটি গ্যাপ’। আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ৩৭ হয়, তবে তার প্রত্যাশিত মাথাপিছু জিডিপি হওয়া উচিত মাত্র ৫ হাজার ৭০০ ডলার। বাংলাদেশের প্রকৃত আয় যদি ২০৫০ সালে ২৪ হাজার ডলারে পৌঁছে, তবে সেখানে ‘আউটপুট গ্যাপ’ দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৩০০ ডলার। এই দুই সূচক অর্থনীতির ভাষায় দুটি দিকের প্রতিফলন—একটি প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে আয় কত হওয়া উচিত, অন্যটি আয় থেকে বুঝতে চাওয়া যে রাষ্ট্র কতটা সক্ষম।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের স্টেট ক্যাপাসিটির দুর্বলতা, বিশেষত সরকারের কার্যকারিতা, আইন-শৃঙ্খলা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মানের অভাব দেশে নানা আর্থসামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষ সরকারি কর্মী থেকে শুরু করে দীর্ঘসূত্রতার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় না। এ কারণে প্রাপ্ত বাজেটের সঠিক ব্যবহার হয় না এবং সরকারের পরিকল্পনাগুলো সফল হতে পারে না, যা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। আইনের শাসনে ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা থাকা বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসনের অভাব দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তোলে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। এ দুর্বলতা দেশের অধিকাংশ জনগণকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। প্রশাসনিক কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশের তুলনায় শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তানের কিছু সূচকে উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তবে তাদের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য স্টেট ক্যাপাসিটি শক্তিশালীকরণ এবং কার্যকর সরকারি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে তার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতার সঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে। নীতিগত পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রমাণ পাওয়া যায় উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ফ্র্যাজাইল স্টেটস ইনডেক্সে বাংলাদেশ ‘উচ্চ সতর্কতা’ ক্যাটাগরিতে ছিল, যার অবস্থান ছিল ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও ইরানের মধ্যে। রুল অব ল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪০ দেশের মধ্যে ১২৭তম, প্রেস ফ্রিডম সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৩তম, করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে ১৪৯তম ও ফ্রিডম হাউজের গণতন্ত্র সূচকে ‘আংশিক স্বাধীন’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কোনো উন্নতি নেই। আমাদের শাসন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা না থাকার পরও অর্থনৈতিক অগ্রগতি হওয়ায় বাংলাদেশকে প্যারাডক্স বলা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের অগ্রগতির সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ধরা পড়ে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকসহ মৌলিক কিছু সংস্কার দরকার। পূর্ববর্তী সরকার তো অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলোও একটা সমস্যা। প্রতিষ্ঠান তো আমরা গড়তে পারিনি, উল্টো অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যে ভূমিকা রাখার কথা সেগুলো রাখতে পারছে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, সবই ভালো হতে পারে, যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান খুব তাড়াতাড়ি হয় না। এটা শুধু কয়েক দিন, মাস কিংবা বছরের ব্যাপার না। এটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।’
বাংলাদেশের পাশাপাশি এশিয়ার আরো ১২টি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা চিত্র উঠে এসেছে এডিবির গবেষণায়। এ দেশগুলো ১৯৯০ সালের পর থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। মিয়ানমার এ তালিকায় বাংলাদেশের চেয়েও বড় ব্যতিক্রম। যদি দেশটি তার ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে, তবে ২০৫০ সালে তার মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৬০০ ডলার। কিন্তু তার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা স্কোর থাকবে মাত্র ৩১ দশমিক ৪, যা এ স্তরের কোনো জিডিপি অর্জনকারী দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্থির চিত্র দেখা গেছে। দেশটি গত তিন দশকে বছরে মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে ২০৫০ সালে তার অনুমিত মাথাপিছু জিডিপি হবে ৯ হাজার ৪০০ ডলার। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বার্ষিক দশমিক ২৮ পয়েন্ট বেড়ে ২০৫০ সালে দাঁড়াবে ৪৩ দশমিক ৫। যদিও এ অগ্রগতি ধীর, তবু অন্তত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আয় একই ছন্দে রয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়।
ভারতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ২০২২ সালেই ভারতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে উচ্চ ছিল। ২০১২ থেকে ২০২২ সময়কালে প্রতি বছর দশমিক ৭৫ পয়েন্ট হারে এটি বেড়েছে। ২০৫০ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার স্কোর হবে ৭৩ দশমিক ৮, যা উন্নত দেশের মানদণ্ডের কাছাকাছি। যদিও এ সময়ে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ৩০ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছবে এবং এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অনুসারে প্রত্যাশিত আয় থেকে কিছুটা কম। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী ও সমজাতীয় অর্থনীতি ভিয়েতনাম এক্ষেত্রে মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও মাথাপিছু জিডিপি দুটোই বাড়ছে। ২০৫০ সালে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি হবে ৫৫ হাজার ৯০০ ডলার এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অনুসারে প্রত্যাশিত জিডিপি দাঁড়াবে ৩৮ হাজার ৬০০ ডলার। এক্ষেত্রে দুয়ের মধ্যে একটি মাঝারি মানের ব্যবধান বিদ্যমান থাকবে। ইন্দোনেশিয়ার চিত্রও এক্ষেত্রে বেশ আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বছরে দশমিক ৯৬ পয়েন্ট হারে। ২০৫০ সালে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি হবে ৩১ হাজার ৯০০ ডলার এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার স্কোর হবে ৭৯ দশমিক ১, যা উন্নত দেশগুলোর মানের পর্যায়ে পড়ে।
এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে কম্বোডিয়া ও লাওসের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি বা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে এ দেশগুলোর ক্ষেত্রে ২০৫০ সালে জিডিপির প্রত্যাশিত মানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মিল থাকবে না। গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি বৃদ্ধি এবং সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে উন্নয়ন মানে শুধুই প্রবৃদ্ধি নয়। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আইনের শাসন ও সামাজিক সহনশীলতা টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি। গবেষণার ভাষায়, উন্নয়নের মহাসড়কে চলতে চাইলে চারটি লেনেই একসঙ্গে এগোতে হবে। প্রবৃদ্ধি যদি বাকি তিন লেনকে ছাপিয়ে যায়, তবে সেই গতি নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। বাংলাদেশসহ যেসব দেশে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন সমান্তরালভাবে হয়নি, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটি—বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধারা কতটা স্থায়ী?
জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে সরকার পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে এডিবির গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে এর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাঠামো ছিল নির্বাচন দিয়ে সরকার পরিবর্তন করার। আমরা সেটা করতে পারিনি। সে সরকারই শক্তিশালী সরকার, যে জানে সিস্টেমের মাধ্যমে নিয়মমাফিক পরিবর্তন করা সম্ভব। সমস্যা হচ্ছে আমাদের পুরো কাঠামোই দুর্বল। আদালত নষ্ট হয়েছে। ফরমায়েশি রায় দেয়া হয়েছে। এখনো যে বিচারকরা নানা কারণে ভয় পাচ্ছেন না, এটা বলা কঠিন। অর্থাৎ একেবারে পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। একটা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে এটা করা সম্ভব বলেও মনে হয় না আমার। কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে না পারলে এটা কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ হবে না।’